বলিউডের অভিনেত্রী জিয়া খান মৃত্যুবরণ করেছেন গত ৩ জুন রাতে। সেদিন তাঁর অ্যাপার্টমেন্টে হাজির হয়েছিলেন বিতর্কিত বলিউডের অভিনেতা আদিত্য পাঞ্চোলি। সম্প্রতি ওই রাতের সিসিটিভি ফুটেজ থেকে সংগ্রহ করা ছবি প্রকাশ করেছেন জিয়ার মা রাবেয়া আমিন। প্রকাশিত ছবিতে আদিত্যর অস্বাভাবিক আচরণ লক্ষ করা গেছে।
জুহু বিচ-সংলগ্ন সাগর সংগীত অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন জিয়া খান। ৩ জুন রাতে তাঁর ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। কয়েক দিন পর প্রেমিক সুরজ পাঞ্চোলিকে দায়ী করে জিয়ার লেখা সুইসাইড নোট পাওয়া যায়। শুরু থেকেই জিয়ার মৃত্যুর জন্য সুরজ ও তাঁর বাবা আদিত্য পাঞ্চোলিকে দায়ী করে আসছেন রাবেয়া আমিন। জিয়ার মৃত্যু-রহস্য নতুন মোড় নেয় ১ অক্টোবর। ওই দিন জিয়া খানকে হত্যার অভিযোগে বোম্বের উচ্চ আদালতে মামলা করেন রাবেয়া। তাঁর মেয়েকে হত্যার পর আত্মহত্যার নাটক সাজানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
একটি পার্টি থেকে ৩ জুন রাতে রাবেয়াকে সাগর সংগীত অ্যাপার্টমেন্টে পৌঁছে দিয়েছিলেন আদিত্য পাঞ্চোলি। রাবেয়ার সঙ্গে মুন্নু ও আঞ্জু নামে আরও দুজনকেও জিয়ার বাসায় পৌঁছে দেন আদিত্য। তিনি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের সামনে তাঁদের নামিয়ে দিয়ে সেখান থেকে চলে না গিয়ে ভবনের আশপাশে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করতে থাকেন।
সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভেতরে ঢুকবেন কি না, তা নিয়ে ইতস্তত করছেন আদিত্য। একপর্যায়ে তিনি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ভেতরে ঢুকতে থাকেন। কিন্তু সিসিটিভি ক্যামেরা দেখে সেখান থেকে বের হয়ে যান তিনি। সে সময় তাঁর আচরণ স্বাভাবিক ছিল না। তাঁকে দেখে বিভ্রান্ত মনে হচ্ছিল। কারও সঙ্গে ফোনেও কথা বলতে দেখা যায় তাঁকে। সম্প্রতি এক খবরে এমনটিই জানিয়েছে ওয়ান ইন্ডিয়া।
চলতি বছরের ৩ জুন নিজ বাসা থেকে জিয়া খানের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। কয়েক দিন পর প্রেমিক সুরজ পাঞ্চোলিকে দায়ী করে জিয়ার লেখা সুইসাইড নোট খুঁজে পান তাঁর বোন। পরে সেটি পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন জিয়ার মা অভিনেত্রী রাবেয়া আমিন। দুই দিন পর জিয়ার আত্মহত্যায় প্ররোচনার দায়ে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারায় সুরজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। কিছুদিন জেলের চার দেয়ালে বন্দী থাকার পর জামিনে মুক্তি পান বলিউডের প্রভাবশালী ও বিতর্কিত অভিনেতা আদিত্য পাঞ্চোলির ছেলে সুরজ পাঞ্চোলি।
মৃত্যুর পর জিয়ার ঠোঁটের ডান পাশে ও হাতে আঘাতের চিহ্নসহ আরও কিছু কারণ দেখিয়ে এটিকে পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড দাবি করে ১ অক্টোবর মামলা করেন রাবেয়া আমিন। মামলার অভিযোগে জিয়া খানের মৃত্যু যে আত্মহত্যা নয়, তার ১০টি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমত, কেউ গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করলে সাধারণত তার জিহ্বা বের হয়ে আসে। কিন্তু জিয়ার ক্ষেত্রে তেমনটা ঘটেনি। দ্বিতীয়ত, সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করলে মৃত ব্যক্তির গলায় যে ধরনের দাগ দেখা যায়, জিয়ার গলায় সে ধরনের দাগ দেখা যায়নি। তৃতীয়ত, জিয়ার গলায় যে দাগ দেখা গেছে, তা কোনোভাবেই ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যাকারীর গলার দাগের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।
চতুর্থ কারণ হিসেবে রাবেয়া উল্লেখ করেছেন, মৃত্যুর পর জিয়ার ঠোঁটের ডান পাশে এবং বাম হাতের কবজিতে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। এটা দেখে মনে হয়েছে, কেউ তাঁকে শক্ত করে জাপটে ধরেছিল। পরের কারণটি আরও ভয়াবহ। যে ঘর থেকে জিয়ার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, তার পাশের ঘরে জমাট বাঁধা রক্ত খুঁজে পেয়েছিলেন বলে দাবি করেছেন রাবেয়া। ওই জমাট বাঁধা রক্ত সংরক্ষণ করে রেখেছেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।
ষষ্ঠ কারণ হিসেবে রাবেয়া উল্লেখ করেছেন, গলায় পাতলা মসলিন কাপড়ের ওড়না পেঁচিয়ে জিয়া আত্মহত্যা করেছেন বলা হলেও, তাঁর গলার দাগের গভীরতা অনেক বেশি। মসলিন কাপড়ের মতো পাতলা কোনো বস্তু কোনোভাবেই এমন গভীর দাগ সৃষ্টি করতে পারে না। রাবেয়া আরও দাবি করেছেন, টুল বা চৌকির ওপর না দাঁড়িয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ফাঁস লাগানো সম্ভব নয়। কিন্তু সিলিং ফ্যান ছোঁয়ার জন্য দাঁড়ানোর মতো উঁচু কোনো বস্তুই নেই তাঁদের বাসায়।
অষ্টম কারণ হিসেবে রাবেয়া জানান, সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, মৃত্যুর কয়েক মিনিট আগে বাসায় ঢোকার সময় জিয়ার পরনে ছিল ট্র্যাকস্যুট। কিন্তু রাতের পোশাক পরা অবস্থায় তাঁর মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। আত্মহত্যা করার আগ মুহূর্তে কেউ পোশাক পরিবর্তন করবে, এটা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়। রাবেয়া আরও দাবি করেছেন, তিনি জিয়ার মৃত্যুর সব আলামত তদন্তকারী কর্মকর্তাদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। কিন্তু সেসব আলামত যাচাইয়ে কোনো রকম গুরুত্বই দেওয়া হয়নি।
সব শেষে রাবেয়া উল্লেখ করেছেন, অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের দ্বিতীয় তলায় তাঁদের ফ্ল্যাট। হত্যাকারীরা বেডরুমের জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে থাকতে পারে। কারণ, অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের প্রবেশপথের ওপরই একটি কার্নিশ আছে। সেই কার্নিশ বেয়ে খুব সহজেই জানালা দিয়ে ঘরের ভেতর প্রবেশ করা সম্ভব।
গত ৩ জুন মৃত্যুর কিছুক্ষণ আগে জিয়া সর্বশেষ ফোনে কথা বলেছিলেন প্রেমিক সুরজের সঙ্গে। তাঁদের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় হয়েছিল। এমনকি জীবনের শেষ চিঠিতে প্রেমিক সুরজের বিষয়ে নানা গুরুতর অভিযোগ করে গেছেন জিয়া। সেগুলোর মধ্যে প্রতারণা, ধর্ষণ ও গর্ভপাতের মতো বিষয়ও ছিল। জিয়ার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকলেও বয়সে ২০ বছরের বড় এক নারীর সঙ্গে প্রণয়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন সুরজ। পাঞ্চোলি পরিবারে গয়না সরবরাহ করতেন ওই নারী। সুরজের অনেক অত্যাচার মুখ বুজে সইলেও প্রেমিকের কাছ থেকে প্রতারণার বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি জিয়া।



0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন