পোলিও বধের নায়ক
‘আমজাদ পৃথিবী থেকে পোলিও নির্মূলের অন্যতম এক নায়ক’। মাইক্রোসফটের
প্রতিষ্ঠাতা ও বিশ্বের অন্যতম সেরা ধনী বিল গেটসের এই প্রশংসাবাণী যাকে
নিয়ে, তিনি বাংলাদেশের ছেলে এএসএম আমজাদ হোসেন।
গত বছর স্বাস্থ্য
ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন
থেকে গেটস ভ্যাকসিন ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড পান ঢাকার ছেলে আমজাদ হোসেন।
শিশুদের পোলিও টিকা দেওয়া নিশ্চিত করার কাজে নিজস্ব মেধা ও কৌশল অবলম্বনের
স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁকে। শুধু বাংলাদেশ নয়, আমজাদ তাঁর
সাফল্যের আলো ছড়িয়ে দিয়েছেন বিশ্বজুড়ে।
বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান
কর্মসূচির একজন জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন
তিনি। কিন্তু সদাবিনয়ী এএসএম আমজাদ হোসেন চেয়েছিলেন আরও বড় কিছু করতে। তিনি
সেই শুরু থেকে বিশ্বাস করতেন, মাহাথির মোহাম্মদের সই বিখ্যাত উক্তি: ‘কোনো
সমস্যা এলে ভয় পেয়ে তাকে এড়িয়ে গেলে হবে না। তা মোকাবিলা করা, সমস্যার উৎস
খুঁজে বের করা হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ।’
মাহাথিরের ওই উক্তিকেই নিজের কাজের মূল প্রেরণা হিসেবে ধরে নিয়েছিলেন তিনি। সাফল্যের সঙ্গে পেরিয়ে গেছেন জীবনের একেকটি ধাপ।
আমজাদ
হোসেনের জন্ম ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পূর্ব খইয়াছড়া
গ্রামে। সরকারি চাকরিজীবী বাবা আখতারুজ্জামান ও মা নিলুফার আখতারের চার
ছেলেমেয়ের মধ্যে আমজাদই সবার বড়। ঢাকার মিরপুরের মনিপুর উচ্চবিদ্যালয় থেকে
মাধ্যমিক পাস করেন তিনি। নটর ডেম কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা
মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসাবিদ্যায় হাতেখড়ি নেন। একটি বেসরকারি
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জনস্বাস্থ্যের ওপর আরও উচ্চতর শিক্ষা নেন।
২০০৩ সালে
জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে যোগ দিয়ে আমজাদ চলে যান টাঙ্গাইলে। টাঙ্গাইলে
সম্প্রসারিত টিকাদান প্রকল্পে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দিয়ে দেখলেন,
অনেক শিশুই জন্মের পর টিকা নেয় না। চার থেকে ছয় মাস পরও অনেকে টিকা নেয়।
তিনি তাঁর সহকর্মীদের বললেন প্রতিটি গ্রামের গর্ভবতী নারীদের একটি তালিকা
করতে। কোন মাসে কোন গ্রামে কোন কোন নারীর সন্তান জন্ম নেবে, তার একটি
তথ্যভান্ডার গড়ে তুললেন তাঁরা। সন্তান ভূমিষ্ঠের পরই তাঁরা হাজির হয়ে
যেতেন। কেউ টিকা থেকে বাদ পড়ল কি না, তা জানতে একটি মূল্যায়ন কৌশলও
(চেকলিস্ট) তৈরি করলেন আমজাদ।
সুফল মিলল অচিরেই
আমজাদের এই আপাতসাধারণ কৌশল প্রয়োগের দুই বছরের মাথায় টাঙ্গাইলে টিকা নেওয়া শিশুদের সংখ্যা ২০ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে যায়। আমজাদের পরের অভিযান ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ। সাফল্য এল সেখানেও। সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির পক্ষ থেকে এই কৌশল ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও হবিগঞ্জ জেলায় প্রয়োগ করা হলো। ওই দুই জেলাতেও টিকাদানের হার ১৭ দশমিক ৪ ও ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়ে গেল।তারপর ডাক এল বিদেশ থেকে। কাজের টানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক হিসেবে নাইজেরিয়া ছুটে গেলেন তিনি। সেখানেও বাজিমাত করল তাঁর বিশেষ টিকাদান নিশ্চিতকরণ কৌশল। তারপর এল স্বীকৃতি। তিনি পান বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশনের প্রথম গেটস ভ্যাকসিন ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড।
গত এপ্রিল মাসে মরু-শহর আবুধাবিতে সারা বিশ্বের ৪০০ জন বিজ্ঞানী ও গবেষক নিয়ে হয়ে গেল বিশ্ব ভ্যাকসিন সম্মেলন। আমজাদ হোসেনকেও ওই সম্মেলনে আলোচনার জন্য ডাকা হয়। সেখানেই বিল গেটস মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্ভাবনী চিন্তার উদাহরণ দিতে গিয়ে আমজাদের প্রশংসা করেন। আমজাদ বলেন, ‘তিনি এত বড় মাপের মানুষ। নিজেই এসে ডেকে কথা বললেন। তিনি আমার কাজ সম্পর্কে জানতে খুবই আগ্রহী ছিলেন।’ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শক হিসেবে নাইজেরিয়ায় কাজ করা আমজাদের কাজের খোঁজখবরও নেন বিল গেটস। আরব আমিরাতের জনপ্রিয় সংবাদপত্র গালফ নিউজসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিল গেটসের পাশাপাশি আমজাদের উপস্থিতির খবর প্রচারিত হয়।
বাংলাদেশে শুরু হওয়া আমজাদের এই কৌশল অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের জন্য অনুসরণীয় হতে পারে বলে মনে করে গেটস ফাউন্ডেশন। তাঁর কাজের ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালের গেটস পুরস্কারটি মোজাম্বিকের মাঠপর্যায়ে কাজ করা স্বাস্থ্যকর্মী মার্গারিডা মাটসিনিকে দেওয়া হয়।
টিকাদান কর্মসূচি মাঠপর্যায়ে সফলভাবে বাস্তবায়নের অগ্রপথিক আমজাদের কাজের পদ্ধতি এখন নাইজেরিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রয়োগ হচ্ছে। তাঁর তত্ত্বাবধানে নাইজেরিয়ার টিকাদান কর্মসূচিতে ইতিমধ্যে সাফল্যও আসতে শুরু করেছে। দেশটির বেশির ভাগ মানুষ এত দিন পোলিওসহ অন্যান্য টিকার আওতার বাইরে ছিল। বর্তমানে সেখানকার ৫০ শতাংশ শিশু টিকার আওতায় চলে এসেছে।
নিজের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বলতে গিয়ে নাইজেরিয়া থেকে মুঠোফোনে আমজাদ হোসেন জানান, মা-নবজাতক ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিত করার পরিকল্পনা নিয়েছেন তিনি। এই পদ্ধতি বাংলাদেশে প্রয়োগের মহা-পরিকল্পনা নিয়ে দেশের ছেলে ফিরে আসতে চান দেশেই।
পদ্মাপারের টুকরো স্মৃতি
রাজশাহী শহরের সঙ্গে সম্পর্ক প্রায় ৫০ বছর হয়ে গেল। এক জীবনে অর্ধশত বছরের স্মৃতি কম নয়। ‘পদ্মাপ্রবাহচুম্বিত’ রাজশাহী শান্ত শহর। এখন অবশ্য রাজশাহী আর শহর নয়, মহানগর। আয়তনে বিশাল। তার পরও তার শান্ত ভাবটা উবে যায়নি। একই রকম রয়ে গেছে। মানুষজনও শান্ত। অল্পেই তুষ্ট। অভিযোগও কম।
রাজশাহীর সঙ্গে সম্পর্ক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসার সুবাদে সেই তরুণ বয়সে।একদিক থেকে রাজশাহী মহানগর তরুণ-তরুণীদেরই। রাজশাহীর মানুষ রাজশাহীকে বলে থাকেন শিক্ষানগর। প্রাতিষ্ঠানিক হল বা হোস্টেল ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের জন্য সারা শহরে অসংখ্য মেস। তৈরি হয়েছে বহুতলবিশিষ্ট মেস বিল্ডিংও। বস্তুত এই ছাত্রছাত্রীরাই রাজশাহীর জনসংখ্যার এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ছুটি হলে বা কোনো কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গেলে পাল্টে যায় রাজশাহীর চেহারা। সবকিছুই ফাঁকা ফাঁকা মনে হয়। এর ছাপ পড়ে পাড়ার মুদি দোকান ও রেস্টুরেন্টগুলোতে সবচেয়ে বেশি।
রাজশাহী মহানগরের ‘সিটি সেন্টার’ হলো সাহেব বাজার। রাজশাহী যতই বড় হোক, তার সব পথ এসে মিশেছে এই সাহেব বাজারে। নানান রকমের জিনিসপত্রের জন্য রাজশাহী শহরের মানুষজনকে সাহেব বাজারে আসতেই হয়। ছাগলের খাওয়ার জন্য কাঁঠালপাতা থেকে শুরু করে মসলাপাতি, শাকসবজি, মাছ-মাংস, টিভি-ফ্যান, ব্যাগ-সুটকেস, কাপড়চোপড়, জুয়েলারি, ওষুধপথ্য সবই পাওয়া যায় সাহেব বাজারে। কেউ আসেন আড্ডা মারতে। সাহেব বাজারের বিভিন্ন দোকানে বেশ আড্ডা হয়। রাজশাহীর মানুষজন আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। সাহেব বাজার রাজশাহীর ব্যাংক পাড়াও বটে। এসব কাজেও অনেককে আসতে হয় সাহেব বাজারে।
সাহেব বাজারের একটি অংশের নাম আরডিএ মার্কেট, সাধারণ মানুষজনের ভাষায় আড্ডি মার্কেট। এটি রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের তৈরি করা মার্কেট। কর্তৃপক্ষ এটি নিয়ে বেশ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। আরডিএ মার্কেটের দক্ষিণ-পূর্বের একটি অংশকে রাজশাহীর মানুষ পরিহাস করে নাম দিয়েছিলেন বাঘের খাঁচা। সে খাঁচা ভেঙে নতুন দোকান হয়েছে। তবে এখনো সেগুলোর কোনো জুতসই নামকরণ হয়নি।
আরডিএ মার্কেট এখন বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই মার্কেটের কারণেই রাজশাহীর নিউ মার্কেট অনেকখানি ম্লান হয়ে গেছে। আর আরডিএর কারণে বদলে গেছে রাজশাহী শহর। এদিক-ওদিক রাস্তা হয়েছে। বের হয়েছে নতুন নতুন
রাস্তা। বেশ চওড়া।
বছর তিরিশেক আগে সাহেব বাজারের এমন অবস্থা ছিল না। এখন যেটা আরডিএ মার্কেট, তার প্রায় পুরোটাই ছিল একটা পুকুর। আর মার্কেটের সামনে ডিভাইডার দেওয়া যে বড় রাস্তা, সেখানে ছিল মিউনিসিপ্যালিটির বিশাল মার্কেট। এ মার্কেটটি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী সম্পূর্ণভাবে পুড়িয়ে দেয়। এ মার্কেটটিও ছিল রাজশাহীর প্রাণকেন্দ্র।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন বাসের বিশাল বহর। আলাদা পরিবহন দপ্তর, প্রশাসক রয়েছে এখন এগুলো দেখাশোনার জন্য। স্বাধীনতার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাস ছিল মাত্র দুটি। একটি চালাতেন আবুল ভাই। আরেকটা চালাতেন জাহাঙ্গীর ভাই। মুক্তিযুদ্ধের সময় আবুল ভাই শহীদ হন। এই দুই বাসের তখন একটাই গন্তব্য—ক্যাম্পাস থেকে কোর্ট। রাস্তাও একটাই। একই রাস্তায় যাওয়া-আসা। ক্যাম্পাস থেকে ছেড়ে আসা বাস তখন শহরে প্রবেশ করত কল্পনা সিনেমা হল থেকে বেঁকে বোয়ালিয়া থানার সামন হয়ে কুমারপাড়ার রাস্তা দিয়ে। বাঁকে বাঁকে পড়ত স্টার স্টুডিও, মুনলাইট ফার্মেসি, কোহিনূর বেকারি, তাজ স্টোর্স, ফারুক লাইব্রেরি। তারপর রাজশাহী কলেজের সামনে দিয়ে ফায়ার ব্রিগেড, সিঅ্যান্ডবি মোড়, রেডিও, মিশন হাসপাতাল হয়ে কোর্ট।
স্বাধীনতার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে খদ্দরের পাঞ্জাবি, ফতুয়া, চাদরের বেশ চল ছিল। বড় মসজিদের পেছনে যেখানে ইলেকট্রিকের নানান দোকান, সেখানেই ছিল শক্তিদার খাদি বিতান। খদ্দরের কাপড় ছাড়াও সেখানে পাওয়া যেত বইপত্র, খাঁটি গাওয়া ঘি। শক্তিদা ছিলেন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী।
একই লাইনে ছিল তৎকালীন রাজশাহীর বিখ্যাত মিষ্টির দোকান ‘জলযোগ’। জলযোগের রসকদম্ব আর প্যাঁড়ার খ্যাতি ছিল প্রবাদপ্রতিম। জলযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। তবে টিকে আছে আরও দুই মিষ্টির দোকান—শাহি হোটেলের পাশে ‘রাজশাহী মিষ্টান্ন ভান্ডার’ আর ভুবনমোহন পার্কের পেছনে পুলিশ ফাঁড়ির পাশে ‘জোড়কালী মিষ্টান্ন ভান্ডার’।
শাহি হোটেল ছিল একালের শহুরে ভাষায় পশ রেস্টুরেন্ট। ছাত্র হয়ে প্রথম প্রথম ঢুকতে একটু অস্বস্তি লাগত। শাহিতে পাওয়া যেত কাটলেট। প্লেটের সঙ্গে আসত ছুরি, কাঁটা, ন্যাপকিন। পাশেই রহমানিয়া। রহমানিয়ার বিখ্যাত ‘দো-রুটি হাফ ভুনা’ এখনো অনেককে স্মৃতিমেদুর করে তোলে। বিকেলে রহমানিয়ার শিঙাড়াও বিখ্যাত ছিল। রহমানিয়া ছিল যথার্থ অর্থেই গণহোটেল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সেখানে ভিড় জমাত বেশি। রহমানিয়া হোটেল এখনো আছে, তবে সেই স্বাদের বড় অভাব। শাহি হোটেল এখন জাতীয় পার্টির অফিস। উঠে গেছে আজাদ, মাজেদিয়া, চাঁদতারা, রাজশাহী রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি হোটেল। বন্ধ হয়ে গেছে মঞ্জু বোর্ডিংয়ের রেস্টুরেন্টও।
রাজশাহীর বইপাড়া ছিল ভুবনমোহন পার্ক পেরিয়ে একটু সামনের দিকে ফারুক লাইব্রেরির মোড় পর্যন্ত। এই মোড় এখন সোনাদীঘির মোড় নামে পরিচিত। এই বইপাড়ায় অবশ্য বেশি পাওয়া যেত পাঠ্যপুস্তক। অন্যান্য বইয়ের জন্য যেতে হতো নিউমার্কেট। রাজশাহী নিউমার্কেটে তখন বেশ কয়েকটি সমৃদ্ধ বইয়ের দোকান ছিল।
রাজশাহীতে তখন তিনটি বিখ্যাত সিনেমা হল—কল্পনা, অলকা আর আনন্দ। কল্পনা, অলকা আগে থেকেই ছিল। পরে এল আনন্দ। পিটার ও’টুল, রেক্স হ্যারিসন, গ্রেগরি পেক, ফ্রাংক সিনাত্রা, ব্রিজিত বার্দোত, জিনা লোলো ব্রিজিডা, সোফিয়া লরেন, লিজ টেলরের অনেক ছবি কল্পনা আর অলকায় দেখা। কল্পনা হলে জেমস বন্ড সিরিজের ছবি ডক্টর নো-এর টিকিট কিনতে মারামারি করতে হয়েছিল। আনন্দ হলে বেশি আসত লাহোরের উর্দু ছবি। তিনটি সিনেমা হলই বন্ধ হয়ে গেছে। আছে শুধু উপহার। উপহার আমাদের সময় ছিল না।
আমাদের সময় অর্থাৎ ১৯৭১-এর আগে রাজশাহীর বদনাম ছিল ধুলোর শহর হিসেবে। টমটম চলা রাস্তায় পতিত অশ্ববিষ্ঠা আর ধুলো মিলে তৈরি হতো ঘোলাটে হাওয়া। রাজশাহীতে নতুন অবস্থায় সে হাওয়ার সঙ্গে চলা বেশ দুঃসাধ্য ছিল। অনেকেই তখন ভুগতেন হাঁচি আর শ্বাসকষ্টে। অ্যালার্জি কথাটা তখনো তেমন চালু হয়নি। মাঝে মাঝে উঠত একটানা ঝড়। পদ্মার বালু আর রাস্তার ধুলোয় ঢেকে যেত রাজশাহী শহর।
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের বদৌলতে ধুলোর সমস্যা মিটে গেছে রাজশাহীতে। সেই বিখ্যাত একটানা ঝড়ও এখন নেই। রাজশাহী আগে যেমন ছিল টমটমের শহর, তেমনি এখন হয়েছে রিকশা আর অটো নামে পরিচিত ত্রিচক্রযানের শহর। এর সঙ্গে দ্বিচক্রযান সাইকেল তো রয়েছেই। এগুলোর কারণেই সাহেব বাজার জিরো পয়েন্ট নামে খ্যাত মোড়টি চরম বিভ্রান্ত এলাকায় পরিণত হয় সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। টমটম বিলুপ্ত হয়নি। সরকারি পিএন গার্লস স্কুলের প্রাচীরের পাশে রয়েছে টমটমের স্ট্যান্ড।
শহরের ঘুম ভাঙে দেরিতে। রাজশাহীরও তাই। প্রভাতে ঘুমভাঙা রাজশাহীকে দেখতে পাওয়া যায় কেবল পদ্মাপারে। সকালে আসেন বিশেষত বয়সী মানুষ। যাঁরা পদ্মাপারেই থাকেন তাঁদের কথা আলাদা। ১০টা-সাড়ে ১০টার মধ্যে দৃশ্য পাল্টাতে থাকে। বিকেলে কেবলই তরুণ-তরুণীদের ভিড়। প্রবীণেরা এলেও অবস্থা দেখে সরে পড়তে পারলেই বাঁচেন। পদ্মার প্রতি রাজশাহীর মানুষের এত টান আগে দেখিনি। পদ্মা বয়ে যেত আপন মনে। ভরা বর্ষায় কেবল পদ্মার পানি বাঁধের কতখানি ছুঁয়ে গেল তা দেখার জন্য কেউ কেউ উৎসাহী হতেন। বাঁধের ওপর দিয়ে অনেক হেঁটেছি। কিন্তু পদ্মার আকর্ষণে থেমে গিয়ে পদ্মার দিকে তাকিয়েছি—এমন মুহূর্তের কথা মনে পড়ে না। গেঁয়ো যোগী যেমন ভিখ পায় না, তেমনি পদ্মা আমাদের কাছ থেকে বিশেষ কোনো বাড়তি মর্যাদা পেয়েছিল বলে মনে পড়ে না।
বর্তমান সময়ের পদ্মাপ্রেমের কারণ বোধ করি ভিন্ন। রাজশাহীর বিখ্যাত বড় কুঠি ঘিরে পদ্মাপারকে সদ্যবিদায়ী মেয়র অনবদ্যভাবে সজ্জিত করেছেন। ফাস্টফুডের রেস্টুরেন্ট আর চটপটির ছাতা মিলে শহরের পদ্মাপার এখন জমজমাট জায়গা। নৌকাভ্রমণের চমৎকার ব্যবস্থাও রয়েছে। আর রয়েছে বাঁধের ওপর দিয়ে পিচঢালা রাস্তা। পদ্মাকে ঘিরে আনন্দের এসব আয়োজনের আকর্ষণও কম নয়।
নৌকাভ্রমণ এখন যেখানে চলে, সেটা এখন নিরাপদ খাল। পদ্মার মূল প্রবাহ সরে গেছে দক্ষিণ-পুবে মাইল দেড়-দুয়েক দূরে। পদ্মা আগে ছিল রাজশাহী শহর ঘেঁষে। শহর রক্ষাকারী যে বাঁধের নিচে ছিল পদ্মার প্রবাহ, এখন সেখানে ঘরবাড়ি।
বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার ৩৫ কি ৪০ বছর পর যাঁরা রাজশাহী যাবেন, তাঁরা দেখবেন রাজশাহীর বহিরঙ্গ রূপ বদলে গেছে অনেকখানি। চমৎকার সব রাস্তা। রাস্তায় রাস্তায় রাতের বেলায় রঙিন বাতি। আগে তো রাস্তায় ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিলাতফেরত শিক্ষকদের হাতে গোনা কয়েকটি প্রাইভেট কার, আর সরকারি কর্মকর্তাদের জিপ। এখন অবস্থা উল্টো। লোকসংখ্যাও বেড়েছে তেমনি। আর আপনি এখন আঙ্কেল হয়ে গেছেন দোকানিদের কাছে। রিকশাওয়ালা কেউ বা মামা সম্বোধনও করতে পারে। এতে মন খারাপ করার কিছু নেই। একটু খেয়াল করে দেখবেন, রাজশাহী শহর বদলালেও শহরের মানুষ বদলায়নি।



0 মন্তব্য(গুলি):
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন